Tuesday, August 4, 2020

বই আলাপ - কৌশিক মজুমদারের ' সূর্যতামসী'


 বই পড়ে গুডরিডসে রিভিউ লিখি প্রায়ই, কিন্তু মাঝেসাঝে কিছু রিভিউ লিখতে লিখতে ওয়ার্ডকাউন্টের তোয়াক্কা করিনা, রিভিউতে ডুবে যাই। তখন এরকম পেটমোটা নাদুসনুদুস রিভিউ বের হয় কীবোর্ড থেকে। এরকম রিভিউগুলোর সাথে পারসোনাল কানেকশনটাও অন্যান্য রিভিউর চেয়ে বেশি। এইটাইপ রিভিউগুলা এখন থেকে ব্লগে তুলে দিবো। 



বইটার ফ্ল্যাপ উলটে দেখলে আপনি জানতে পারবেন এই মেনুতে আছে উনিশ শতকের কলিকাতা, গোপন ষড়যন্ত্র, সিম্বোলজি, দুর্ধর্ষ চাইনিজ গুপ্তসঙ্ঘ, ফ্রি ম্যাসন, একের পর এক নৃশংস হত্যাকান্ড এবং জাদুবিদ্যা। এতোগুলো দারুণ মশলায় মাখানো এক সুস্বাদু রহস্যোপন্যাস আপনার হাতে, তাতে থ্রিলারগ্রাসী পাঠকমনের জিভে জল আসাটা স্বাভাবিক, কিন্তু তার উপর অনলাইনে ধুন্ধুমার ব্র্যান্ডিং আর পাবলিসিটি দেখলে আশার পারদ বেড়ে যায় আরও। কিন্তু কতোটুকু দিতে পারলো সূর্যতামসী? এক শতাব্দী আগেকার বিজ্ঞাপনের ঢঙ্গে ব্যাক কভারে লেখা ‘অতীব রহস্যময় উপাদেয় ডিটেকটিভ উপন্যাস’ এর বিশেষণ কতটা সার্থক হলো, নাকি বদহজম হওয়ায় ভোজন শেষে উলটে দিতে হলো এই পাঁচমেশালি প্লট?

একবাক্যে সে উত্তর খোঁজা সহজ হবে না, তাই সে চেষ্টা করছি না।

সূর্যতামসীকে পুরদস্তুর গথিক মিস্ট্রি বলা চলে। তবে ভিক্টোরিয়ান এরা’র লন্ডনের প্রশস্ত রাস্তা, সুউচ্চ প্রাসাদ, আর ধোঁয়াটে পাবের বদলে সূর্যতামসীর প্লট এসে ঠেকেছে ১৮৯৩ সালের ভারতবর্ষে,, আরও ঠিকভাবে বললে - কলকাতা আর চুঁচুড়ার গলিঘুঁপচি, চীনাপাড়া আর নিষিদ্ধ পল্লিতে। বইয়ের একটা অংশ অবশ্য বর্তমান ২০১৮’র টাইমলাইনে চলছে, তবে উনিশ শতকের কলিকাতা বর্তমান কলকাতাকে কাহিনীর ঘনঘটনায়, বর্ণনার খুঁটিনাটিতে আর রহস্যময়তায় ছাপিয়ে গেছে বহুগুণে।

বইটার ফ্ল্যাপে কিছুটা ড্যান ব্রাউনিয় কায়দায় লেখা আছে মূল কাহিনীটা বাদে বইয়ে ব্যবহৃত সকল স্থান, স্থানিক ইতিহাস, গুপ্তবিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান/জাদুবিদ্যার খুঁটিনাটিসহ বেশ কিছু ঘটনা সত্য। মজার ব্যাপার হলো, শুধু কাহিনী আর ঘটনা বাদেও বইয়ের কয়েকজন প্রধান চরিত্র রক্তমাংসের ঐতিহাসিক ব্যাক্তিত্ব। যেমন গথিক কলকাতার দুই (নাকি তিন?) প্রোটাগনিস্টের মধ্যে একজন হলেন প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়, যাকে অভিজ্ঞ পাঠক চিনবেন প্রিয়নাথ দারোগা হিসেবে। উপমহাদেশের প্রথম প্রকাশিত বাংলা গোয়েন্দা কাহিনীগুলোর মাঝে অন্যতম ‘দারোগার দপ্তর’ এর ট্রু ক্রাইম লেখাগুলো প্রিয়নাথ দারোগার পুলিশ জীবনেরই কেস ফাইলস। আবার আরেক প্রোটাগনিস্ট হলেন ছন্নছাড়া গণপতি, যার জীবনের সকল ঝোঁক ম্যাজিকের প্রতি। এই গণপতিই যে বাংলার অগ্রণী ম্যাজিশিয়ান গণপতি দ্য গ্রেট, জাদুকর পি.সি. সরকারের গুরু, সেটা আমার মতো অনেক পাঠকই খেয়াল করবেন না ধরিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত। এরকম বেশ কিছু ঐতিহাসিক চরিত্রকে খুব সুচারু ভাবে তাদেরও বইয়ের ঘটনার জালে জড়িয়ে ফেলার জন্য লেখকের একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য থাকবে।
তবে লেখক এই পর্যন্ত এসে ক্ষান্ত দেন নি, এইসব ঐতিহাসিক চরিত্রের বেড়া ডিঙিয়ে ইতিহাসের ফিকশনাল চরিত্রকেও টেনে এনেছেন গল্পে। সে ব্যাপারে বেশি বললে স্পয়লার হয়ে যাবে, তাই না বলি।

জনরা/সাবজনরায় আটকে ফেলা কতোটুকু ঠিক জানিনা, কিন্তু সূর্যতামসী আগাগোড়া একটা রহস্যোপন্যাস হিসেবেই মর্যাদা পাবে আমার কাছে। বর্তমানের হরেক রকম থ্রিলারের/হররের মাঝে একটা নিখাঁদ ডিটেকটিভ মিস্ট্রি বেশ রিফ্রেশিং ছিলো। এখানে গোয়েন্দারা তদন্তে নেমে কিছুক্ষণ পরপরই রোমহর্ষক অ্যাডভেঞ্চারে জড়িয়ে যায়নি, আবার হিরোয়িক ফাইট সিকোয়েন্সও জুড়ে বসেনি পদে পদে, বরং একদম খাটি হুডানিট মিস্ট্রির মতো রহস্যের পেছনের রহস্য খুলে এসেছে পরতে পরতে। বেশ খাটনি করে দাঁড় করানো একটা প্লটকে গল্পের বুননে মোটামুটি ভালোই গাঁথতে পেরেছেন লেখক।
তবে গল্পটা বহুলাংশেই প্লট ড্রিভেন থেকে গেছে, ক্যারেক্টার ড্রিভেন হতে পারেনাই। চরিত্রগুলো কিছুটা একমাত্রিক মনে হয়েছে। গথিক পার্টের তারিণী, প্রিয়নাথ আর সাইগারসন - সবাইকেই কমবেশি সদা সত্যসন্ধানী কান্ডারির মতোই উপস্থাপন করা হয়েছে, চরিত্রের গভীরতা কম মনে হয়ছে। তাই তাদের প্রতি আকর্ষণটা যতটুকু হওয়া উচিত ছিলো ততটুকু হয়নি। সেই আকর্ষণ কেড়ে নিয়ে গেছে গঙ্গার ঘাট আর করিন্থিয়ান থিয়েটারের স্টেজের গণপতি দ্য গ্রেট। চরিত্রগুলো সাদাকালোর মতো ভালো-খারাপের বাইনারি না করে আরেকটু ভার্সেটাইল করলে বাকিদের প্রতি আকর্ষণটা যথাযত হতো।
আর বর্তমান সময়ের প্রোটাগনিস্ট তুর্বসুর ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট আর্কটা সুন্দর, ওয়েল হ্যান্ডেলড। বর্তমানের এক দেশি প্রাইভেট ডিটেকটিভের কাজ যে কমবেশি ডিভোর্স কেস নিয়েই হবে, সেটাও বিশ্বাসযোগ্য।

তবে প্রোটাগনিস্টের বিষয়ে একটা কথা বলা প্রয়োজন, একই কাহিনীতে একাধিক গল্প একই সাথে চলতে থাকলে, দুই ক্ষেত্রেই প্রোটাগনিস্টের বিষয়টা পরিষ্কার থাকলে ভালো হয়। যেমন বর্তমান সময়ের প্রোটাগনিস্ট তুর্বসুর সাথে পাঠকের বোঝাপড়া হতে কোনো সমস্যাই হয়না, কিন্তু অতীতে একবার তারিণী, আরেকবার প্রিয়নাথ, আবার মাঝদিয়ে গণপতি, এবং এই তিনের উপর দিয়ে আবার সাইগারসন - এতোগুলো পজিটিভ প্রটাগনিস্ট চরিত্র এলে পাঠক খেই হারিয়ে ফেলতে পারে। সেই ব্যপারে আরও একটু সতর্কতা অবলম্বন করলে ভালো লাগতো।

ইতিহাস নিয়ে লিখতে গেলে, তাও আবার এরকম পুরদস্তুর গথিক সেটিং এ ঐতিহাসিক চরিত্রদের নিয়ে লেখা বইয়ের জন্য কম পড়াশোনা করার সুযোগ নেই, বইয়ের শেষে লেখকের সহায়ক গ্রন্থের ফিরিস্তি দেখলে বোঝা যায় লেখক একদম ফাঁকি দেন নি। লেখক নিজে বেশ ভালো নন-ফিকশন রাইটার, তাই তার রিসার্চ আর পাঠকের কাছে তথ্যের উপস্থাপনটাও বেশ স্বতঃস্ফূর্ত। কিন্তু কতটুকু বিদ্যে লেখক তার লেখা দিয়ে পাঠককে জানাবেন, তা নিয়ে হয়তো ভাবার বেশ কিছু জায়গা আছে।

সে বিষয়ে বলার আগে লেখকের গদ্য নিয়ে বলা উচিত।
সূর্যতামসী বইয়ের গদ্যভাষা ঝরঝরে, মেদহীন। যতটুকু ভিজ্যুয়াল বর্ণনা প্রয়োজন লেখক ঠিক ততটুকুই দিয়েছেন, লেখার সাথে গল্পের গাঁথুনি খুব ভালোভাবে এগিয়েছে। অন্যান্য বইয়ের তুলনায় চাপ্টারগুলো ছোটছোট, তাই পাঠকে তরতরিয়ে পড়ে ফেলতে পারেন। প্রিয়নাথ দারোগার ডায়েরী, সেকালের গোয়েন্দা তারিণীচরণের ডায়রী, লেখকের দৃষ্টি থেকে তৃতীয় পুরুষে বর্ণনা আর বর্তমান সময়ের প্রোটাগনিস্ট তুর্বসু নিজ বর্ণনা- বইটা চারটা ভিউপয়েন্ট থেকে লেখা, যা প্রায় প্রতি চাপ্টারে পরিবর্তিত হয়েছে।
দৃষ্টিকোণ বদলের সাথে সাথে ভাষার পরিবর্তনটা প্রশংসনীয়, যেমন প্রিয়নাথ দারোগার ডায়েরী সাধুভাষায় সেকেলে বর্ণনা, সেকেলে যতিচিহ্নের ব্যবহার দেখা যায়, আবার তারিণীর ডায়রীতে বা লেখকের অতীত বর্ণনায় ব্যাবহারিক ইংরেজি শব্দের আধিক্য কম - যা আবার পরিপূর্ণ ভাবে আছে বর্তমানে তুর্বসুর বর্ণনায়।

এই পরিবর্তনগুলো একদম যথাসই হলেও, একটা জিনিস সবগুলো চাপ্টারেই স্বমহিমায় বিদ্যমান, সেটা হলো এক্সপোজিশন, সোজা বাংলায় ব্যাখ্যা প্রদর্শন। এবং এই এক্সপোজিশনই হচ্ছে এই বইয়ের দুমুখো ছুড়ি। কিছুক্ষণ আগে লেখকের বিস্তর পড়াশোনার প্রশংসা হচ্ছিলো, একটা হিস্টোরিকাল ফিকশনে সবার আগে দরকার পর্যাপ্ত রিসার্চ এবং দ্বিতীয়তে প্রয়োজন সঠিক এক্সিকিউশন। হিস্টোরিকাল ফিকশন অথবা মিথোলজি বেজড ফিকশনে পাঠককে পর্যাপ্ত পরিমাণ তথ্য-ইতিহাস-পাতিহাস জানানোটা আবশ্যিক, সেটা না জানিয়ে উপায়ও নেই। সে কারণেই রবার্ট ল্যাংডন সিম্বোলজির ফিরিস্তি শোনাতে গল্পের মাঝে ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যান তার ক্লাসরুমে, বা অন্যান্য বইয়ে সিধু জ্যাঠাগোত্রীয় জ্ঞানের জাহাজীরা এসে পর্যাপ্ত তথ্য শিখিয়ে পড়িয়ে যান পাঠককে।
এই এক্সপোজিশন তখনই গল্পকে আরও তুখোড় করে তোলে যখন তা সঠিক জায়গায় কোন বিশ্বাসযোগ্য সংলাপে বিশ্বাসযোগ্য লোকের কাছ থেকে জানছে পাঠক। এই বইয়েও তথ্য আর গল্পের পার্টনারশিপ বেশ কিছু জায়গায় দারুণ কাজ করেছে, পাগলাগারদের সিকোয়েন্সটা অথবা করিন্থিয়ান হলের কাহিনী উল্লেখ্য। কিন্তু যখন গল্পের প্রতিটা চরিত্রই কমবেশি জ্ঞান ঝেড়ে তার এক্সপোজিশন সিকোয়েন্স ঝাড়তে থাকে, কিংবা লেখককেই বারবার তার তৃতীয় পুরুষ বর্ণনার মাঝে দশাসই তথ্যের এক্সপোজিশন করতে দেখা যায়, তখন পাঠকের কাছে গল্পের গাড়ি বারবার ব্রেক কষছে এমনটা লাগতে পারে বইকি। বিরক্তি উদ্রেক হওয়াটাও স্বাভাবিক।
পর্যাপ্ত তথ্য জানানো ছাড়াও এরকম এক্সপোজিশনের আরেক ধরনের ব্যবহার হচ্ছে খুব দারুণ কোন তথ্য পাঠককে জানিয়ে চমকে দেওয়া, চরিত্রের জ্ঞান-গরিমা বোঝাতে । যেটা পড়তে ভালোই লাগে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু শুধু চটকার তথ্যের সাইজ যদি দেড় পৃষ্ঠা পেরিয়ে যায় তখন পাঠকের বিভ্রান্ত হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
আরও একটা বিষয় এখানে উল্লেখ্য, আমি বাংলাদেশি না হয়ে পশ্চিমবঙ্গের কেউ হলে হয়তো স্থানগুলোর সাথে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কানেক্ট করতে পারতাম। সেক্ষেত্রে হয়তো ভ্রুকুটি কিছুটা কম হতে পারতো। ঢাকা নিয়ে এমন বিশদ রিসার্চ করা একটা ফিকশন পড়তে যে বেশ দারুণ লাগতো, এই বই পড়তে গিয়ে ভালোমতোই টের পেয়েছি। ( ঢাকা নিয়ে এমন কিছু দেখেছিলাম মাশুদুল হকের কাল্ট থ্রিলার ‘মিনিমালিস্ট’ এর একটা অধ্যায়ে, ঢাকার আহসান মঞ্জিল থেকে ঐতিহাসিক হট এয়ার বেলুন ওড়ানো নিয়ে দারুণ একটা সিকোয়েন্স ছিলো। )

আর নামকরণের বেলায়, জীবনানন্দের কবিতার নামে নামকৃত এই বই আদতেই যে শুধু কবিতার নামকরণেই সীমাবদ্ধ না, কাহিনীর মাঝপথেই টের পাওয়া যাবে তার। বইয়ের শুরুতে এবং শেষে জীবনানন্দের পংক্তি, আর অধ্যায়ের নামকরণে কবিতার নাম ব্যবহার করাটা দারুণ মানিয়ে গেছে।

সূর্যতামসীর বইটার পেছনের কথাও একটু বলা উচিত। বইটার বাঁধাই, প্রচ্ছদ, ছাপা বেশ ভালো, প্রকাশনা বুকফার্ম এক্ষেত্রে প্রশংসা পাবে। তারা এসব বাদেও আরও একধাপ বেশি করেছেন, বইয়ের শুরুর আর শেষের ব্লার্ব অংশটাতেও রঙিন আর্ট পেপার ব্যবহার করে ইলাস্ট্রেশন জুড়ে দিয়েছেন, বইয়ের প্রোডাকশনকে অন্য একটা মাত্রা দিয়েছে এটা। আর বইয়ের লেখার ফাঁকে ফাঁকে গৌতম কর্মকারের কালিতুলিতে আঁকা ডার্ক এবং গ্রিটি আর্টওয়ার্ক গুলো উপরি পাওনা ছিলো, উপন্যাসের লেখার ফাঁকে হঠাৎ দুই পৃষ্ঠা জুড়ে কোনো টেক্সটবিহীন স্প্রেড আর্টওয়ার্ক দেওয়াটাও একটা সাহসী পদক্ষেপ।

তবে এইখানে একটা বিষয় একটু বলতে চাইছি, শিল্পীর আঁকা নিঃসন্দেহ মুগ্ধ করেছে কিন্তু কাহিনীর সাথে তার অসামঞ্জস্যতা দেখে কিছুটা হতাশও হয়েছি। শুরুর ছবির বর্ণনায় ১৮৯৩ এর গভীর রাতে পালকি করে চায়নাটাউনে যাওয়ার দৃশ্যের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি চারিদিক ভয়ানক সুনশান, রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট ছাড়া কেউ নেই। কিন্তু ইলাস্ট্রেশনে দেখা যাচ্ছে রাস্তার দুই ধার ভর্তি লোকসমাগম। আবার তুর্বসুর দেবাশীষদার প্রথম দেখার দিন বর্ণনায় আছে যে তুর্বসু বৃষ্টিতে কাপড় ভিজিয়ে ফেলায় ধুতি শার্ট পরে নিয়েছে, কিন্তু ইলাস্ট্রেশনে তাকে দিব্যি শার্ট প্যান্ট পরাই দেখা যায়। এই ভিজ্যুয়াল ভুলগুলো আঁকিয়ের অনেস্ট মিস্টেক কিনা, নাকি তাকে দেওয়া নির্দেশনার অপর্যাপ্ততা তা জানিনা।

সবমিলিয়ে সূর্যতামসী একটা পড়ার মতো বই, অবশ্যপাঠ্য কিনা সে বিচার করা সহজ নয়। হয়তো এই বই না পড়লে আপনার পাঠকজীবনের অর্থ বৃথা হয়ে যাবেনা, কিন্তু পুরোনো দিনের নানান ঘটনায় ঠাসা একটা রহস্যোপন্যাস মিস করবেন। বাংলায় গথিক মিস্ট্রি উপন্যাস খুব বেশি নেই, তার মধ্যে এটা একটা অন্যতম উদাহরণ হয়ে থাকবে নিশ্চিত । একটা ভালো শক্ত প্লটের রহস্যোপন্যাস পড়তে চাইলে পড়তে পারেন, কিংবা আমার মতো কোনো ফিকশনের সাথে ননফিকশনের একগাদা ফিরিস্তি শুনতে ভালো লাগলে পড়তে পারেন।

অতি অতি অতি মৃদু স্পয়লার- বইটার সিকুয়েল আসবে এরকম কোন আভাস ছিলোনা, কিন্তু বইয়ের শেষে খুব ভালোমতই আগামী বইয়ের ইঙ্গিত দেওয়া আছে। সিরিজ হবে আগে থেকে জানতাম না, তাই সেটা একটা চমকই ছিলো।


রেটিং - ৩.৭/৫


জুলাই ২৪, ২০২০

Thursday, July 30, 2020

কমিক্স প্রজেক্ট - Bangladeshi Folk Stories

গতমাসে মেহেদী ভাই জিজ্ঞেস করেছিলেন একটা কমিক্সের প্রজেক্ট আছে, করবো কিনা। একটা অর্গানাইজেশনের জন্য মোট ৫টা অ্যান্থলজি কমিক বই হবে, নির্দিষ্ট টপিকের কয়েকটা ছোট কমিক্স থাকবে প্রতিটা বইয়ে। পুরান ঢাকার ইতিহাস, বাংলাদেশী লোকগাঁথা, সংস্কৃতির ইতিহাস, আদিবাসী লোকগাঁথা - এরকম কয়েকটা টপিক। একবাক্যে দেশি Folk Stories টাই বেছে নিলাম, এটায় মনসামঙ্গল, গাজী কালু চম্পাবতী, মহুয়ার পালা - এমন দারুন সব গল্প আঁকার সুযোগ আছে বলে। 

আঁকতে গিয়ে খুবই মজা পাচ্ছি, আর বুঝলাম ড্রয়িং স্কিল যেমনই হোক না কেন, ভালো কমিক্স আঁকতে হলে কমিক্স আঁকার আলাদা প্র্যাকটিসই প্রয়োজন।  

বিভিন্ন গল্প থেকে কয়েকটা পেইজ তুলে রাখি, প্রজেক্ট শেষ হলে আলাদা ব্লগ পোস্ট দিবো এ নিয়ে। 
বেহুলার প্রাথমিক ক্যারেক্টার ডিজাইন, 
ছোটদের স্টাইলে আঁকবো ভেবেছিলাম। 
কিন্তু পরা অন্য স্টাইলে গেছি। 

অহংকারী চাঁদ সওদাগর,
ছোটদের স্টাইলে। এটাও পরে বদলেছে। 




Sunday, June 21, 2020

প্রিয় গ্রাফিক নভেলস


ফেসবুকে পড়ুয়াদের একটা  প্রাইভেট গ্রুপ Atheneaum এ আদ্রিতা গ্রাফিক নভেল সাজেশন চেয়ে পোস্ট দিয়েছিলো, সেই পোস্টের কমেন্টে লেখা এই সাজেশন। ভাবলাম ব্লগে তুলে দেই। 

ডিসি মার্ভেল যেভাবে কমিক কালচার আর গ্রাফিক নভেল কালচারটাকে ডমিনেট করে রাখছে, সেই জন্যে অনেক ভালো ভালো গ্রাফিক নভেল অনেকের চোখ এড়ায় যায়। স্পেশালি ইউরোপ এর গ্রাফিক নভেল কালচারটা বেশ আন্ডাররেটেড। এছাড়া ডিসি ভার্টিগো, ইমেজ আর ডার্ক হর্স পাবলিকেশনেরও বেশ কিছু সিরিজ দারুণ কিছু রান আছে। লাস্ট দশ বছরে ইন্ডিয়া থেকেও বেশ কিছু দূর্দান্ত গ্রাফিক নভেল বের হয়েছে। যাইহোক, আমার পড়া থেকে র্যান্ডমলি কিছু নাম অ্যাড করি। শুরুতে ওয়েস্টার্ন, এরপর ইন্ডিয়ান আর শেষে বাংলাদেশের কমিকস/ গ্রাফিক নভেল গুলার নাম থাকলো

( প্রায় সব ইংরেজি বই-ই ফ্রি তে পড়া যাবে read comics online . to তে । লিঙ্কটা ফেসবুকে ব্লকড, গুগল সার্চ দিলে সহজেই পাওয়া যাবে। cbr ফরম্যাটও অ্যাভেইলেবল ইন্টার্নেটে, নামিয়ে পড়তে চাইলে। তবে বাংলাদেশি গুলা অনলাইনে নাই, কিনে পড়লেই ভালো। রকমারি খোলা আছে, বাতিঘরও দেখলাম অনলাইন অর্ডারে ডেলিভারি দিচ্ছে। )

১. Watchmen - Alan Moore/ Dave Gibbons

এইটা ডিসি'র, কিন্তু ইউনিভার্স থেকে একদম আলাদা একটা স্বতন্ত্র বই। ইনসেনলি পপুলার সুপারহিরো জনরাটাকে খুবই আলাদা পার্স্পেক্টিভ থেকে দেখে লেখা, একটা রিয়েলিস্টিক অ্যাপ্রোচে। আর এতোগুলা ক্যারেক্টার একসাথে ডিল করার পরেও ( যেখানে একটা ক্যারেক্টার রীতিমতো গড), ক্যারেক্টার আর্কগুলা ইনসেনলি গুড। বেশ থটফুল, সাথে মেটাফিকশনের ইউজটাও মুগ্ধ করার মতো। এই বইটা সেরা ১০০ আমেরিকান লিটারেচার ( শুধু কমিকস না, ওভার অল) এর তালিকায় আছে। ডেভ গিবনসের আঁকা খুবই সুন্দর, সাথে খুব ডিফরেন্ট সেকেন্ডারি কালার প্যালেট।

২. V for Vendetta - Alan Moore/ David Lloyed

একটা অরওয়েলিয়ান ফিকশন, বিগ ব্রাদার আর কন্ট্রোল্ড গভার্ন্মেন্ট এর সেটিং এ লেখা। মুভিটা মোটামুটি মনেহয় সবাই-ই কমবেশি দেখে ফেলসে, বইটার এন্ডিং আলাদা। এই বইয়ের স্ক্রিপ্ট রাইটিং সবচেয়ে অসাধারণ লাগে আমার, ভিক্টোরিয়ান/এলিজাবেথিয়ান লিটারেচার, স্পেশালি শেক্সপিয়ার এর কাজ থেকে যেভাবে কোট ইউজ করা হয়েছে গাই ফক্স এর ডায়লগের জন্য। আঁকার স্টাইল বেশ আনসেটলিং আর ডার্ক, বড় বড় কালির পরতে আঁকা।

৩. Y the Last Man - Brian Vaughan

এটাও ভার্টিগো। ডিস্টোপিয়ান স্টোরির নিয়ে এতো ইন ডেপথ কাজ কমই পড়ছি। কাহিনী এক লাইনে বললে, একদিন সকালে মেইন ক্যারেক্টার ইয়োরিক ব্রাউন বাসা থেকে বের হয়ে দেখে রাস্তায় সব মানুষ মরে পরে আছে। তারপর টের পায় সব মানুষ না, সব পুরুষ। ব্যাসিকালি ওয়াই ক্রোমোজম সম্বলিত সব মানুষ মরে গেসে। কাহিনীটা যতটা হাস্যকর লাগতেসে শুনতে বইয়ে সেটা ততটাই সিরিয়াস, খুবই ভালো রিয়েলিস্টিক ডেপিকশন দেখাইসে এরকম সিচুয়েশনের, আর ক্যারেক্টার আর্কের সাথে স্টোরি প্রোগ্রেশন খুবই ভালো। বেশ লম্বা রান ছিলো এটার, ৬ বছর ধরে পাবলিশ হয়েছে, মোট ৬০টা ইস্যু। এন্ডিং নিয়ে অনেকের মতভেদ আছে, বাট জার্নিটা অসাধারণ।

৪. Persepolis - Marjan Satrapi

মার্জান সাত্রাপির অটোবায়োগ্রাফিকাল গ্রাফিক নভেল, ইরানে তার বেড়ে ওঠা আর নিজের চোখে দেখা ইসলামিক রেভুল্যুশন নিয়ে লেখা একটা কামিং অফ এইজ বই। দুই পার্টে বের হয়েছিলো ফ্রেঞ্চ ভাষায়, এখন একসাথেই পাওা যায়। গ্রাফিক নভেলের মূল উপজীব্য যে গল্পকথন, সেটা খুব ভালোভাবে বুঝা যায় এই বইটা পড়লে। অত্যন্ত সিম্পল সাদামাটা ড্রয়িং, কিন্তু এতো সিরিয়াস একটা গল্পকে অদ্ভুত সুন্দর ভাবে কমপ্লিমেন্ট করে।

৫. Habibi - Craig Thompson

প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার বিশাল কলেবরের উপন্যাস। এই বইয়ের প্রত্যেকটা দাগ লেখকের নিজের হাতে দেওয়া, আঁকা থেকে শুরু করে টেক্সট এমনকি, পেইজ নাম্বার পর্যন্ত। শুধু কালি দিয়ে এতো পুঙ্খানুপুঙ্খু নকশা দেখতে অবিশ্বাস্য লাগে। এইটায় ইসলামিক মিথোজ খুবই নতুনভাবে এক্সপ্লোর করা হইসে, আর অ্যারাবিক ক্যালিগ্রাফি নিয়ে যেই সুন্দরভাবে সিম্বোলিক আর ফিলোসফিকাল কিছু কাজ করসে সেইটা দেখার মতো। মূলত আরবদেশে এক ছোট্ট মেয়ের হারিয়ে যাওয়া থেকে শুরু, কাহিনী মহাকাব্যর মতোই অনেক দূর গড়ায় যায়। তবে কিছুটা ওয়েস্টার্ন পার্সপেক্টিভে অরিয়েন্টালিজমের দোষে দুষ্ট।
কিন্তু অবশ্যই হাইলি রেকমেন্ডেড একটা বই।

৬. Blankets - Craig Thompson

অটোবায়োগ্রাফিকাল কামিং অফ এইজ স্টোরি। উইসকন্সিনে দুই ভাইয়ের বেড়ে উঠার গল্প, ক্রিশ্চিয়ানিটি নিয়ে এক্সপ্লোরেশন আছে। হার্টফেল্ট একটা বই। এইটাও সাইজে হাবিবির কাছাকাছি, ছয়শো পৃষ্ঠার মতো।

৭. MAUS - Vladek Spiegelman

ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু তে হলোকাস্টের নিয়ে একটা কন্টেম্পোরারি ক্লাসিক বই। হিটলারের রেজিমে জার্মানিতে একটা জিউ পরিবারের গল্প। এই বইটায় সব জিউরা ইঁদুর, আর জার্মানরা বিড়াল, আমেরিকানরা কুকুর।

৮. Sandman - Neil Gaiman

এটা নিয়ে আসলে ঠিকভাবে বলা যায়না। হিপনোটিক, মিস্টিকাল, ফিলোসফিকাল ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষায়িত করা যেতে পারে। মিথোলজি, রিলিজিওন, হিস্টোরি, ফিলোসফি সব একাকার হয়ে মিশে গেছে গেইম্যানের লেখায়। মূল চরিত্র ড্রিম, যার আরেক নাম লর্ড মর্ফিয়াস। সে কোন গড না, প্রাণী না, ভূত না বা মানুষ না। সে একজন *এন্ডলেস*।

৯. Saga - Brian Vaughan

এপিক স্পেস অপেরা জনরার বই। মাত্র দুবছর আগে এইটার সিরিজের রান শেষ হয়েছে। ক্রিটিকদের ভাষায় 'স্টার ওয়ার্স মিটস গেইম অফ থ্রোন্স'। আমি তিন ভলিউম পড়েছি, গ্রিপিং। এতোগুলা আলদা আলাদা স্পিসিজ আর তাদের অডনেস পড়তে বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে।

১০. Vyasa : The Beggining - Shibaji Bandyopadhyay/ Shankha Banerjee

ঋষি ব্যাসদেবের মুখে মহাভারতের আদি পর্বের রিটেলিং। জলরং এ দূর্দান্ত আঁকা, গ্রিপিং স্টোরি। মহাভারতের অনেকগুলা ঘটনার নিয়ে বেশ কিছু কন্ট্রোভার্সিয়াল আর লজিকাল প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ওভারঅল স্টোরিটেলিং এর ভঙ্গিটাই খুব চমৎকার, মহাভারতের ফ্যান যে কারোরই খুব পছন্দ হওয়ার কথা।

১১. Ramayana 3392 AD - Shamik Dasgupta

সাই ফাই রেন্ডিশনে বলা রামায়ণের গল্প। ফিউচারিস্টিক বেশ কিছু টুইস্ট আছে, কাহিনীরও অদলবদল আছে। মূল প্রোটাগনিস্ট সূর্যবংশী চার ভাই, রাম, লক্ষণ, ভরত আর ধৃষ্টদ্যুম্ন। আঁকা তেমন ভাল্লাগেনাই। ওভার অল মোটামুটি বই, রামায়ণের খুব ভক্ত হলে পড়ে দেখা যেতে পারে।

১২ পঞ্চ রোমাঞ্চ - কাজী আনোয়ার হোসেন/ ঢাকা কমিক্স ( বাংলাদেশ)

অ্যান্থোলজি গ্রাফিক নভেল। ৭০ দশকের কাজীদার দূর্দান্ত অ্যাডাপটেশনের ৫টা ডিফরেন্ট গল্প, ৫ জন আর্টিস্টের আঁকায়। খুবই ফ্রেশ রিড। স্পেশালি প্রথম গল্পটা, 'অন্য কোনখানে' তে আরাফাত করিমের আঁকা আদারওয়ার্ল্ডলি। (পান ইনটেনডেড)

১৩. রিশাদ ট্রিলোজি - ঢাকা কমিক্স ( বাংলাদেশ)

সাইফাই একটা তিন বইয়ের সিরিজ, এখন একসাথে পাওয়া যায়। ভালো-খারাপ এর বাইনারি ডেফিনিশনকে একটু অন্যভাবে দেখা একটা গল্প। এক্সপেরিমেন্টাল আঁকার স্টাইলটা বেশ মজার।

১৪. দূর্জয় - তৌহিদুল ইকবাল সম্পদ/ ঢাকা কমিক্স ( বাংলাদেশ)

এটা এখনো ১৪ ইস্যু পর্যন্ত অনগোয়িং, শেষ হয়নাই। অ্যাকশন ক্রাইম থ্রিলার জনরার, ভিজিলান্টিও বলা যায়। ধুন্ধুমার অ্যাকশন, আর লোকাল এলিমেন্ট ইউজ করে বলা গল্প। বাংলাদেশি সিরিজ হিসাবে ওয়ার্থ আ ট্রাই।

১৫. লাইলী - শাহরিয়ার খান/ পাঞ্জেরী ( বাংলাদেশ)

ভায়বহ হিউমারাস। এক মারদাঙ্গা মেয়ের গল্প, কমেডি ড্রামা। পুরানো বই, মেইবি ২০০৮ সালের। তাই শাহরিয়ার এর শুরুর দিকের বেসিক আলীর হিউমার এর মতোই গোল্ড।

১৬. কিউব - শাহরিয়ার খান/ পাঞ্জেরী ( বাংলাদেশ)
 
সাই ফাই কমেডি বলা যায়। তার অন্যান্য বইগুলার চেয়ে খুবই আন্ডাররেটেড। সিরিয়াস সাইফাই এলিমেন্টের সাথে এতো হিউমারাস ডায়লগস আর ক্যারেক্টারের মিশেল খুব বেশি দেখিনাই।

১৭. Lathial - Mighty Punch Studios ( বাংলাদেশ) 

**বাংলাদেশি ইংরেজি কমিক, হাই ফ্যান্টাসি জনরা। এই ইউনিভার্সে সব রকম দেশি ফোকলোর/রূপকথার ক্যারেকটার কোএক্সিস্ট করে। Vangala রাজ্যে Xatigan বন্দরে একটা সরাইখানা থেকে গল্পের শুরু, গল্পে একে একে যোগ হয়েছে লালকমল-নীলকমল, ডালিম কুমার, বাবুরাম সাপুড়ে সহ আরও অনেক দেশি ক্যারেক্টার্স। বেশ ফ্রেশ আর ইন্টারেস্টিং অ্যাপ্রোচ।

Wednesday, May 27, 2020

হাবিজাবি

এই করনাবন্দি রোজায় যা যা হাবিজাবি কাজ করা হয়েছে তার মধ্যে কিছু কাজ তুলে দেই।

অভিনেতা উইলেম ড্যাফো, দেড় দুই ঘন্টা ধরে আঁকা।
The Lighthouse দেখে নতুন করে এই লোকের ফ্যান হয়ে গেলাম। সাধারণত আমার পোর্ট্রেইট খুব কম করা হয়, তাই সেটা ঝালাই করার চেষ্টা। 


 মাঝে কিছু Environmental painting করার চেষ্টা করেছিলাম।  তার মধ্যে এটা বেশ সময় নিয়ে আঁকা। ভেবেছিলাম একটা কুইক পেইন্টিং করবো, দেখা গেল অনেকগুলো ঘন্টা নিয়ে ফেললো। ২০১৫র পুরনো একটা কাজের নতুন ভার্সন এটা।
আগের কাজের সাথে তুলনা

এটা ৫০ মিনিটের একটা কুইক পেইন্টিং। ব্রাশ নিয়ে ঘাটাঘাটি করছিলাম। 
এটা একটা কনসেপ্ট আর্ট। ছোটবেলার একটা প্রিয় বই থেকে বেশ কিছু কনসেপ্ট ডিজাইন, ক্যারেক্টার ডিজাইন করছি। সে নিয়ে আপডেট পরে দিবো। ক্যারেক্টার স্টাডির মাঝখানেই একরাতে এই কনসেপ্ট আর্টটা করা। ইন্সপিরেশন ছিলো প্রখ্যাত আর্টিস্ট Loish এর কাজগুলা। 
কালার নিয়ে ঘাটাঘাটি করে দারুণ মজা পেয়েছি।

সিএফএস এর মনন ভাই একটা লোগো চেয়েছিলেন লেটারিং বেজড, সার্ভিস শপের জন্য। সেই লোগোর কাজ। 
একটা বাংলা আর দুইটা ইংলিশ লেটারিং। কোনটা ফাইনাল হয়েছে জানিনা। 


এই কাজটা a2i এর জন্যে করা, একদিন উইন্ডমিলের সুমন পাটওয়ারি ভাই কল দিয়ে বললেন একটা কাজের জন্যে ফ্রি আছি কি না। সেখান থেকেই এই কাজ। সারাদেশের বিভিন্ন ফার্মেসিতে পোস্টার/ব্যানার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কথা।

ফাইট এগেইন্সট করোনা কার্টুন কম্পিটিশন : আমার ঝড়ে মরা বক

গতমাসে (এপ্রিলে) নিজের কাজ/লকডাউন/ঘরবন্দিত্ব এসবের ফ্রাস্ট্রেশনে সব সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করে বসে আছি, ছবি আঁকায় একদম মন বসছে না তাই রাতদিন বইপড়া আর সিনেমা দেখা চলছে। অমন সময় একদিন তন্ময় ভাইয়ের ফোন, জানালো যে ফাইট এগেইন্সট করোনা কার্টুন কম্পিটিশনের টাইম বেড়েছে, আমি যেন মনে করি সাবমিশন দেই।

মনে পড়লো, ফেসবুক ডিঅ্যাক্টিভেট করার আগেই খবরটা দেখছিলাম, কার্টুন পিপল করোনার সাবধানতা বিষয়ক একটা কার্টুন কম্পিটিশন আয়োজন করবে, মূল উদ্দেশ্য সিলেক্টেড সব কার্টুন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পাঠিয়ে দেওয়া, কপিরাইট ছাড়াই ফ্রি ইউজ/ ডিস্ট্রিবিউশনের জন্য।

যাইহোক, তন্ময় ভাই জানালেন আরও নতুন একটা খবর আছে। Access to Information, মানে a2i এই কন্টেস্টের প্রাইজ মানি দিচ্ছে মোট এক লাখ টাকা, ফার্স্ট প্রাইজ ৫০ হাজার, সেকেন্ড আর থার্ড যথাক্রমে ৩০ আর ২০ হাজার টাকা।

Add caption

নতুন ডেডলাইন সম্ভবত ২৩ তারিখ ছিলো, আমি ২১ তারিখ রাতে ফেসবুক ওপেন করলাম। প্রতিযোগীতার মূল থিমে দেওয়া আছে WHO থেকে অনুমোদিত করোনা সম্পর্কে সচেতনতার বিষয়গুলা। মাথায় মধ্যম মানের দুই একটা আবছা আইডিয়া ঘুরঘুর করছিলো, ভাবলাম আঁকা শুরু করি, কিন্তু সেই রাতে ডেল টোরোর একটা সিনেমা দেখতে গিয়ে আর আঁকা হলোনা, ঠিক করলাম পরদিন শেষ সময়েই আঁকবো। পরদিনও ঘুম থেকে উঠতে গিয়ে বিকেল ( করোনার কারণে ৩৬০ ডিগ্রি উলটো স্লিপ সাইকেলের কারণে)। আঁকতে বসতে গিয়ে মোটামুটি সন্ধ্যা হয়ে গেল, আজকে রাতের মধ্যেই যা আঁকার এঁকে জমা দিয়ে দিতে হবে। 

প্রথমটা। কবি সুকান্তর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।  

প্রথম কার্টুনটা কিছুটা ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিং স্টাইলে আঁকলাম। চাঁদ আর করোনা নিয়ে কার্টুনটা ওইরকমই একটা অ্যাপ্রোচ ডিমান্ড করছিলো। তবে এই কার্টুনটা ঠিক প্রতিযোগীতার নিয়ম মেনে আঁকা হয়নাই, সচেতনতা বা করোনা প্রতিরোধের ব্যাপারটা ছিলোনা। সেটা জেনেশুনেই এইটা আঁকা, ভিজ্যুয়ালটা বেশ পছন্দ হয়ে গেছিল বলে।

প্রথমটার মোটামুটি মিডিওকার একটা আইডিয়া নিয়েই আঁকা, খুব আহামরি কোনো আইডিয়া পাচ্ছিলাম না বলে। দেখা গেল একটা আঁকতে গিয়েই দেখি আরও অনেকগুলা আইডিয়া আসছে, তারপর আরেকটা আঁকতে গিয়ে আরও অনেকগুলা। দেখা গেল ভোর পর্যন্ত চারটা কার্টুন এঁকে ফেলেছি এক বসায়।
তবে আইডিয়ার পাশাপাশি এইবার যেটা করেছি, নিজের কার্টুন স্টাইলটাকে চেঞ্জ করেছি। ওল্ড মাস্টার কার্টুনিস্ট সার্জিও অ্যারাগোনেসের বিখ্যাত কমিক সিরিজ GROO পড়ছিলাম। বারবার মুগ্ধ হয়েছে তার আঁকার ফ্লুয়েন্সিতে, আর মজাটায়। আমাদের মতো সবকিছু একদম ঝাঁ চকচকে ক্লিন আর সব ফর্ম-অ্যানাটমি মেনে আঁকা আড়ষ্ট কার্টুন না, বরং হালকা মেজাজে আঁকা দারুণ স্টাইলিস্টিক একটা অ্যাপ্রোচ, প্রচুর কুইক লাইনস । পুরনো দিনের ম্যাড ম্যাগাজিনের কার্টুন বা নিউজপেপার বক্স কার্টুনগুলা যেরকম আঁকা হতো, সেরকম। তাই ওই ফ্লুয়েন্সিটাও ধরার চেষ্টা করেছি এবার কার্টুন স্টাইলে, এবং সেটা খুবই এনজয় করেছি। বহুদিন পর আঁকতে বসে এক রাতে চারটা কাজ নামিয়ে ফেলতে এতো ভাল্লাগবে আগে বুঝিনাই।
প্যারানয়া নিয়ে একটা আইডিয়া ছিলো। 

এইটা পার্সোনাল ফেভারিট। এঁকে খুব মজা পেয়েছি।

সবার শেষে আঁকা। আনন্দ নিয়ে কালার করেছি।


যাইহোক, এতোকথার পর মূল কথা বলা যাক। ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে। রেডিও ঢোলের একটা লাইভ শো তে উইনার রিভিল করার কথা। তন্ময় ভাই আরজে কায়সার ভাইয়ের সাথে টপ ৩০ কার্টুন নিয়ে আলোচনাক করছেন, আমরা সবাই মোটামুটি অধৈর্য্য হয়ে শুনছি। এরপর হঠাৎ ‘কী হইতে কী জানি হইয়া গেল’ দেখা যে আমার একটা কার্টুনের পাশে ( যেটা সবার শেষে এঁকেছিলাম) ফার্স্ট প্রাইজ ট্যাগটা ঝুলছে।

সেকেন্ড আমাদের রাকিব রাজ্জাক, আর থার্ড হয়েছেন সৈয়দ ফিদা হোসেন ভাই ( চারুকলার বেশ সিনিয়র বড় ভাই, উনার পেইন্টিং দেখে বারবার দেখে মুগ্ধ হই, ট্রেডিশনাল/ডিজিটাল দুই-ই।)

মরা বক

তো প্রথম যে হয়ে যাবো এটা একদমই এক্সপেক্ট করিনাই। টপ ফিফটি কার্টুন নিয়ে কম্পিটিশনের জুরি প্যানেল লাইভ ডিসকাশন করেছিলেন, সেখানে জুরি ছিলেন বস আহসান হাবীব, ছড়াকার অনিক খান হলিউড সিনেমারভিএফেক্স ওয়াহিদ ইবনে রেজা। লাইভে আমার কার্টুনগুলা নিয়ে বস, অনিক ভাই আর বাপ্পী ভাইয়ের ভূয়সী প্রশংসা শুনে রীতিমতো লজ্জা পেয়ে গেছিলাম, স্পেশালি বসের মুখে শুনে।
যাইহোক, কম্পিটিশনে কার্টুন জমা পড়েছিলো ৭০০+, সেখান থেকে সেরা দেড়শো অনলাইনে এক্সিবিট করা হয়েছে। বেশ অনেক কার্টুনিস্টের অসাধারণ সব আইডিয়ার কার্টুন দেখে মুগ্ধ হয়েছি। সবচেয়ে প্রিয় কার্টুন গুলা হলো ঐশিক জাওয়াদ, রেহনূমা প্রসূন, রাকিব আরকে, হাসিব কামাল এর।
 অনেক মানুষ কংগ্রাচুলেট করেছে, আমি একদম ক্যাবলা হাসি দিয়ে জ্বি জ্বি করে গেছি, মনে মনে মরা বক হাতে ভুয়ো ফকির হয়ে ঝড়ের কাছে ধন্যবাদ দিয়েছি।

Saturday, April 25, 2020

ফ্ল্যাশ ফিকশন : জাতিস্মর




একদিন হঠাৎ আমার স্মৃতি ফিরে আসতে শুরু করলো।
আবিষ্কার করলাম, কয়েকশ বছরের পুরনো স্মৃতি স্পষ্ট মনে করতে পারছি আমি। এমনকি বিপ্লবের আগের স্মৃতিও।
দেড়শ বছর আগে, দ্বিতীয় বিপ্লব সফল হওয়ার পর মহামতী বিপ্লবীরা সেই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলেন। বাধ্যতামূলক অপারেশনের মাধ্যমে সবার এ পর্যন্ত সকল স্মৃতি মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত । উদ্দেশ্য - সব বঞ্চনা, শোষণ আর শ্রেনীবিভেদের স্মৃতি, প্রভুদের স্মৃতি যেন ভুলে যায় সবাই। যেন সকলে নতুন এক স্মৃতিকুঠুরি নিয়ে জীবন শুরু করতে পারে এই বিপ্লবপরবর্তী নয়া-পৃথিবীতে।
আমার স্মৃতিস্মরণের খবর ছড়িয়ে পড়লো খুব দ্রুত। প্রথমে পাড়ার লোকজন, এরপর শহরের বাসিন্দারা ছুটে এলো আগ্রহভরে। এরপর এলো বিভিন্ন হলো-পোর্টালের সাংবাদিকরা। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলাম আমি, কিছুদিনের ভেতর ডাক পড়লো বিভিন্ন টকশো আর রিয়েলিটি শোতে।
সেই থেকে আমি গল্প বলে বেড়াই, প্রদেশ থেকে প্রদেশে। কাড়াকাড়ি করে টিকেট কিনে হলভর্তি শ্রোতারা অপেক্ষা করে আমার জন্যে। তাদের আমি গল্প শোনাই, অনেক আগের অন্য এক পৃথিবীর গল্প। প্রভুদের গল্প। নিশ্চিহ্ন হওয়া অদ্ভুত দুপেয়ে প্রাণিদের গল্প, যারা পৃথিবী-অন্তঃরীক্ষ সবটা জয় করতে চাইতো।
স্মৃতি নিংড়ে সব গল্প উগড়ে দেই শ্রোতাদের কাছে। তারা সকলে মুগ্ধ হয়ে শোনে, নিগূঢ় মনযোগে।
ভুল বললাম অবশ্য, সকলে মুগ্ধ হয়না। শ্রোতাদের অনেকে আবার খুব পুরনো মডেলের, তাদের প্রসেসরের মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতা নেই।

০২.০৪.২০২০

 ১৩০ শব্দের এই ছোটগল্পটা লিখেছিলাম ফেসবুকে রিয়াদ ভাইয়ের #গালগল্প চ্যালেঞ্জে। নিয়ম ছিলো ১০০ শব্দের মধ্যে একটা ফ্ল্যাশ ফিকশন লিখে ফেলতে হবে। আমার কিছু শব্দ বেশি হয়েছে। চ্যালেঞ্জটা চমৎকার, ভাবছি আরও কয়েকটা এরকম লিখে ফেলবো। 

প্রথম ব্লগ : করোনাকালীন ফ্রাস্ট্রেশান, অ্যাচিভমেন্ট এবং পড়াশোনা


ব্লগে লেখালেখি শুরু হলো।
নিজের জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা সাধারণত খোলাখুলি বা বিস্তরভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখা হয় না। খেয়াল করে দেখলাম যা ভাবি, যা পড়ি, যা দেখি, শিখি বা করি; সেসব নিয়ে ভাবনাগুলার প্রোগ্রেশনের কোনো  রেকর্ড নাই। তাই অনেকটা নিজের জন্যই ব্লগ খোলা, অনিয়মিত ভাবে নিজের জীবনের, কাজের বা ভাবনার আপডেট দেওয়ার জন্য একটা জায়গা। দেখা যাক কদ্দিন উৎসাহ থাকে এই ব্লগ নিয়ে, আর কদ্দিন ধরে আপডেট দেই।


হিসাব করে দেখলে আজকে আমার ঘরবন্দি জীবনের ৩৯তম দিন। শুরুর দিকে পর্বতসমান উৎসাহ ছিলো, সারাবছর একশোটা কাজ aka প্রজেক্ট aka খ্যাপ ঘাড়ে নিয়ে হিমশিম খেয়ে কোনমতে দিন কাটাই আর চোখের সামনে যাকে তাকে দেখেই ‘ভাই কী যে প্যারায় আছি আর বইলেন না’ বলে নিজের দুঃখগাঁথা শোনাই। সারাক্ষণ মনেহয় ইশ্‌ এই কাজটাই লাস্ট, ‘আর কোনো কাজ নিবোনা। এরপর খালি নিজের প্রজেক্ট ( অ্যানিমেশন শেখা, নিজের কমিক্স, নিজের ব্লগ, ইন্সটাগ্রামে মাহাকাব্য খোলা ইত্যাদি ইত্যাদি আকাশকুসুম স্বপ্ন) আর সেলফ ইমপ্রুভমেন্ট।’ কিন্তু সিসিফাসের পাথরের চাঁই ঠেলে বারবার পর্বতে ওঠানোর মতো প্রত্যেকবারই কোন না কোন কারণে আরেকটা কাজে জড়িয়ে যাই, নিজের জন্য সময় করা হয় না।

তো কোয়ারান্টাইনে ঢুকে শুরুতেই তিনটা প্রজেক্টের অফার ফিরিয়ে দিয়ে নিজেকে পিঠ চাপড়ে বাহবা দিয়ে একদম কোমর বেঁধে নিজের স্কিল ইমপ্রুভমেন্টে নামলাম। হিউম্যান অ্যানাটমি আর ভ্যালু পেইন্টিং শেখার জন্য স্টাডি করা শুরু করলাম, সাথে বহুদিন বাদে নিজের কমিক সিরিজ মাহাকাব্যের জন্য কমিক আঁকা শুরু হলো। আর পাশাপাশি নেটফ্লিক্সে জমে থাকা সিরিজের বিঞ্জ ওয়াচিং আর বাসায় To Read তালিকার উঁচু বইয়ের স্তুপ থেকে একটা একটা করে বই নামিয়ে পড়াও চললো।
ভ্যালু পেইন্টিং ক্যারিক্যাচার : প্রথম শিকার
দুঁদে ক্যারিক্যাচারিস্ট বন্ধু আকিব


দ্বিতীয় শিকার: La Casa de Papel
সিরিজের প্রফেসর। সিরিজের
পুরোটাই এই গৃহবন্দী অবস্থায়
 বিঞ্জ ওয়াচ করা। 
কিছুদিন বাদে মনে হলো এবার নিজের কমিক্সের স্ক্রিপ্টটা ফাইনাল করা শুরু করি। এরপর ভাবলাম, তার আগে আরও কিছু ফিকশন লিখে লেখালেখিটা ঝালাই করে নেই। এবার শুরু হলো ফিকশন রাইটিং। নান রকম গল্প ভাবি, এক জনরার গল্প ভাবতে ভাবতে অন্য জনরায় গিয়ে ঠেকে। নিজের অজান্তেই এক সাইফাই গল্প ভাবতে ভাবতে লেখা শুরু করে দেখি যে গল্পের বিষয় পুরোটাই সাইবারপাংক এরিনা বটফাইটিং এ গিয়ে ঠেকেছে। সেটা নিয়েই কেটে গেল সপ্তাহখানেক। আর কোয়ারান্টাইনের শুরুতেই স্লিপ সাইকেল দুম করে উলটে গেছিলো। সেই নতুন সাইকেলটাও পাকাপোক্ত হয়ে গেল এর মধ্যে।

ফটোশপে কিছু পেইন্টারলি রাফ ব্রাশ নিয়ে ঘাটাঘাটি। 

ততদিনে সবাই মোটামুটি সিরিয়াসলি নিয়ে ফেলেছে করোনাকে, দেশ লকডাউনে চলে যাচ্ছে। অনেকগুলা প্রিমিয়াম লার্নিং সাইট তাদের সাবস্ক্রিপশন ফ্রি করে দিলো। Society of Visual Storytelling এর ওয়েবসাইট svslearn এর উপর লোভ ছিলো অনেকদিন। সেখানে দূর্দান্ত সব আঁকিয়ের নিজস্ব অনলাইন কোর্স করা যায়, মাসিক ফি ২৫ ডলার। ওরা একমাসের ফি ফ্রি করে দেওয়ায় জেইক পার্কারের ‘রোবটস অ্যান্ড মেকানিকাল ড্রয়িং’ ( বলাই বাহুল্য, রোবট ফাইটিং নিয়ে গল্প ঝোঁক থেকেই, ডাবল দা ট্রাবল!) কোর্সটা করা শুরু করলাম। ওইদিকে Scribd.com নিজেদের এক মাসের সাবস্ক্রিপশন ফ্রি করে দিলো, সেখানে রাজ্যের সব অডিওবুক শোনা যায় খুব আরাম করে। আঁকতে আঁকতে অডিওবুক শোনাও চললো রাতভর।

বেশ কয়েকদিন লেখালেখি আর এই দূর্দান্ত কোর্সের অনেকগুলা ক্লাস করতে করতে আবিষ্কার করলাম যে ছোটগল্প ভেবেছিলাম হাজারখানেক শব্দে শেষ করবো, তিন হাজার শব্দ পেরিয়ে গেলেও গল্প মাত্র অর্ধেকে। সেই অর্ধেক গল্প নানান জনকে আগ্রহভরে পড়তে দেই, রিঅ্যাকশন দেখি।

ইতিমধ্যে ১৫/২০ দিনের মতো কেটে গেছে, টের পাচ্ছি যে যেই পর্বতপোম উৎসাহ নিয়ে সবকিছু উদ্ধার করে ফেলার টার্গেট নিয়ে সবকিছু শুরু করেছিলাম, ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি। একসময় দেখি আর লিখতে ভাল্লাগছেনা, গল্পটা একঘেয়ে লাগছে, এমনকি আঁকতেও ইচ্ছা করছেনা। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলাম, কোন লাভ নেই। মাউস হুইল দিয়ে মাইলের পর মাইল ফেসবুকে নিউজফিড স্ক্রল করে আর ‘ধুরো কিচ্ছু করা হচ্ছেনা কেন?’ ভেবে ভেবেই সব সময় কেটে যাচ্ছে। এই সমস্যা কিছুদিন পর ফ্রাস্ট্রেশনে পরিণত হলো, সব সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করে দিলাম। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলাম, দেখলাম স্কেচবুক বা গ্রাফিক প্যাড কোনোটাতেই আঁকতে বসার দুই মিনিট পর একদম ভালো লাগছেনা, আঁকা হচ্ছেনা, লিখতে বসলে একি লাইন বারবার ব্যাকস্পেস দিয়ে কাটতে কাটতে হাত ব্যথা হয়ে যাচ্ছে, আরও বেশি হতাশায় ডুবে যাচ্ছি। ঘরবন্দি থাকাটা যে এভাবে মানসিক ভাবে চেপে ধরবে, আগে বুঝতে পারিনাই। এভাবে আমার লেখালেখি, আঁকা, নিজের কমিকস, নিজের ব্লগ, ইন্সটাগ্রামে মাহাকাব্য খোলাসহ যাবতীয় সকল বড় বড় প্ল্যান থেমে গেল। তখন একটা ভয় ঢুকলো মনে, ‘ আমি জানি এতো বড় ফ্রি টাইম আমি আর কখনো পাবো না, তাও আমি সময়টা শুধু নষ্ট করে যাচ্ছি।’ এই কথার ভয়। এটা বেশ কিছুদিন ভোগালো।

এতো হতাশার ভেতরও কিছু ভালো দিক আছে, সিলভার লাইনিং যাকে বলে, সেগুলা বলি।

ঠিক করলাম যে চাপ কম নেই, ক্রিয়েটিভিটিতে জোরাজুরি করে লাভ হবেনা। তবে তাই বলে সময়টা অন্য ভাবে কাজে লাগানো শুরু করলাম, নিজে কিছু না করতে পারলেও গাছের ফল চেখে দেখতে তো দোষ নেই। ওই যে কোয়ারান্টাইনের শুরু থেকে নিয়মিত বই পড়ার কথা বলেছিলাম, খেয়াল করলাম যে এতদিনে একটু একটু করে অনেকগুলা বই পড়া হয়ে গেছে। তো সেটাই কন্টিনিউ করলাম, দিনে বই পড়ি বাকি রাতে সিনেমা/সিরিজ দেখি, আর বাকিটা সময় ঘুমাই। ওপার বাংলার অনেকগুলা রিসেন্ট সিনেমা এতোদিন দেখবো দেখবো করেও দেখা হয়নাই, Hoichoi এর একটা অ্যাকাউন্ট খুলে সেগুলাও একটা একটা করে দেখে ফেললাম। আর SVS এর ফ্রি মান্থ এর সময়ও ফুরিয়ে আসছিলো, তাই কোর্সগুলাও শেষ করে ফেললাম। কোর্সের নোট নিতে নিতে স্কেচবুক পরিণত হলো প্রায় নোটবুকে।

টেবিলে একে একে জড়ো
হওয়া বইয়ের একাংশ।
জেক পার্কারের রোবট ড্রয়িং এর কোর্সটা করার পর আরও কয়েকটা কোর্স করেছি, যার মধ্যে Lee White এর Visual Storytelling Techniques কোর্সটা নিঃসন্দেহে দারুণ। এটা আঁকাআঁকি শেখার কোর্স না, বরং একটা আঁকা দিয়ে গল্প বলার বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন প্যাসাডেনার আর্টসেন্টার থেকে পড়ে আসা এই ইলাস্ট্রেটর। মূলত চিলড্রেন বুক আঁকার পেছনের থট প্রসেসকে আরও লেভেল আপ করতে চাইলে বেস্ট অপশন।


যাইহোক, সিনেমা দেখা, বই পড়া, কোর্স করা চললো। করোনার আগে এতোকাল হয়তো মাসে সর্বোচ্চ তিনটা বই পড়া হতো, গত এক মাসে সেটা হয়েছে মোট ষোলটা। নট ব্যাড! এর মধ্যে তন্ময় ভাই একবার ফোন করে রিমাইন্ডার দিলেন আসন্ন ফাইট এগেইন্সট করোনা কার্টুন কন্টেস্টের জন্য কার্টুন দিতে। সেজন্যে প্রথমে ম্যাসেঞ্জারে ব্যাক করলাম, এরপর দুদিন আগে ফেসবুকে। কম্পিটিশনের ডেডলাইন ছিলো ২৩ তারিখ, তার আগের এক রাতে চারটা করোনা বিষয়ক কার্টুন করে জমা দিলাম। বহুদিন বাদে একটানা এঁকে গেছি, একটার পর একটা আইডিয়া আর নিজের ইচ্ছামতো একেকটা এক্সিকিউশান, মনে হচ্ছিলো আরও একদিন সময় পেলে আরও পাঁচটা এঁকে ফেলতাম। যাইহোক, সেই কার্টুন নিয়ে আলাদা পোস্টে বলবো।

ব্লগ আপাতত শেষ, এই বন্ধে যা যা পড়লাম তার একটা লিস্ট তুলে দেই। অনেকগুলার রিভিউ-ই গুডরিডসে লিখেছি। তাও দুই এক লাইনে কিছু যোগ করতে ইচ্ছা হলে সেগুলাও যোগ করে দিলাম।

১. ধনুর্ধর - সিদ্দিক আহমেদ

হিস্টোরিকাল ফিকশন জনরার বই, আড়াই হাজার বছর আগের পাঞ্চাল আর কুশলের যুদ্ধ নিয়ে। খুবই ইফোর্ট দিয়ে লেখা, গল্পের পলিটিকাল প্যাচ, একশন, রাজরাজরাদের গেইম অব থ্রোন্সের কথা মনে করিয়ে দেয়। গল্পের মধ্যে জর্জ মার্টিনের লেখারও একটা সুর আছে। ছোটখাট ইস্যু আছে, এন্ডিং নিয়েও অনেক কিছু বলা যায়। কিন্তু সব মিলিয়ে খুবই আলাদা একটা বই। শুধু থ্রিলার পড়ুয়াদের গন্ডির বাইরেও এই বইয়ের মর্যাদা হওয়া দরকার। আরও জানতে চাইলে গুডরিডসে আমার বিস্তারিত রিভিউ এখানে

২. Habibi - Craig Thompson

প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার একটা মহাকাব্যিক গ্রাফিক নভেল। শুধু কালিতে আঁকা, পুরো বইয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন ডিজিটালের কাজ নাই, এমনকি টেক্সট গুলাও হাতে লেখা। অসাধারণ ডিটেইলিং, বিব্লিকাল স্টোরিটেলিং, রেলিজিওনের গল্পগুলার এক্সপ্লোরেশন এতো দারুণ। বইটা শেষ করার পর মাথা ফাঁকা হয়ে ছিলো।
গুডরিডসে আমার আবেগপ্রবণ রিভিউ পড়তে পারেন এখানে

ঢাউস সাইজের গ্রাফিক নভেল হাবিবি।
দেখলেই ভক্তি ভক্তি লাগে।
কালি তুলি দিয়ে আঁকা নিখুঁত ডিজাইন আর দূর্দান্ত ড্রয়িং


৩. Smoke And Mirrors - Neil Gaiman


প্রিয় লেখকের প্রথম গল্পসমগ্র। অনেক আলাদা, অনেক এক্সপেরিমেন্টাল, অনেক গল্পই কবিতা হয়ে গেছে, কিছু হয়েছে মঞ্চ নাটক। কিন্তু সবগুলার মধ্যেই গাইম্যানের সেই অদ্ভুত শিরশিরে জাদুর ছোঁয়া আছে। সবার হয়তো ভালো লাগবেনা, গাইম্যানের পাঁড় ভক্তদের জন্য রেকমেন্ডেড।

৪. Ocean at the End of the Lane - Neil Gaiman
বহুদিন ধরে পড়ার জন্য রেখে দেওয়া। এটা পড়িনাই, Scribd থেকে অডিওবুক শুনেছি কাজ করতে করতে। বইটা পড়তে খুবই আপন লেগেছে, খুবই খুবই পার্সোনাল একটা বই যেন, অথচ এইটা ফ্যান্টাসি বই!

৫. সদত হসন মন্টো রচনা সংগ্রহ - রবিশংকর পাল

ওপার বাংলার বই, আমার পড়া মান্টোর তৃতীয় গল্পসমগ্র। বইয়ের বিশেষত্ব হলো বিখ্যাত গল্পগুলো বাদে তার অন্যান্য লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যাওয়া গল্পগুলো প্রাধান্য পেয়েছে। সাথে মান্টোর নিজের লেখা কিছু প্রবন্ধ, একটা চিঠি আর একটা নাটকও আছে। অনুবাদগুলো ঝরঝরে। সবমিলিয়ে বইটা ভীষণ পছন্দ হলো, পয়সা উসুল।

৬. স্বাধীনতা যুদ্ধে অচেনা লালবাজার - সুপ্রতিম সরকার

ট্রু ক্রাইম নিয়ে কোলকাতার লালবাজার পুলিশ হেটকোয়ার্টার্সের বিভিন্ন কেস ফাইল নিয়ে লেখা বইয়ের সিরিজ লালবাজার। তবে এই বইটা আলাদা, লালবাজার ও তার আশেপাশে ঘটে যাওয়া স্বদেশি আন্দোলনের অনেকগুলো অপারেশন তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের লেখার হাত বরাবরের মতই প্রশংসনীয়।

৭. অবয়ব - তানজীম রহমান

বর্তমানের থ্রিলার/ ফ্যান্টাসি/ হরর লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে আলাদা লেখকের বই, অনেক আগ্রহভরে কেনা। হরর জনরার বই, পড়ে বোঝা যায় উনি ডেলিবারেটলি এক্সপেরিমেন্টালভাবেই বইটা লিখেছেন। তবে আমার সবমিলিয়ে আমার জন্য তেমন জমেনাই বইটা।

৮. দ্য স্ট্রেঞ্জার - আলবেয়ার কামু

পড়ার সময় একটা ঘোরের ভেতর ছিলাম। মনে ধরেছে। বাকি বইগুলা পড়ে ফেলতে হবে।

৯. Punk Rock Jesus - Sean Murphy

আইজনার অ্যাওয়ার্ড জয়ী আর্টিস্ট শন মার্ফির নিজের লেখা নিজের আঁকা কমিক্স। দূর্দান্ত আঁকা, আর গল্পের প্লটও খুব চমৎকার। বিশাল মাল্টিবিলিওনিয়ার কোম্পানি জিসাস ক্রাইস্টের ডিএনএ থেকে তার ক্লোন করলো, আর তার জীবন/ বেড়ে উঠার উপর ২৪ ঘন্টা লাইভ রিয়েলিটি শো করা শুরু করলো। খুবই ইন্ট্রিগিং প্লটলাইন। আমার বড়সড় রিভিউটা পড়তে চাইলে পড়তে পারেন এখানে

শন মার্ফির ঝকঝকে আঁকা। বর্তমানে
ডিসির সবচেয়ে প্রিয় আর্টিস্ট আমার।
punk rock jesus hq - Pesquisa Google | Arte punk, Arte de cómics ...
বিব্লিকাল! 

১০. আমেরিকা! আমেরিকা!! - আহসান হাবীব

বস আহসান হাবীবের অ্যামেরিকা ভ্রমণের বই, বসের চিরাচরিত হিউমারভরা ফুরফুরে লেখা, একদম পার্ফেক্ট লাইটরিড। বইভর্তি ছবি, সবগুলা লেখাই আগে ফেসবুকে পড়া থাকলেও আবার পড়তে তাই ভালোই লাগলো। যখন ফ্রাস্ট্রেশনে পড়ে প্যারা খাচ্ছিলাম, তখনকার জন্য একদম যুৎসই দাওয়াই।

১১. Fortunately The Milk - Neil Gaiman

এটাও অডিওবুক হিসেবে শোনা। ভীষণ মজার একটা বাচ্চাদের বই, পড়ে মনে হইলো এরকম ছোটদের গল্প না লিখতে পারলে লেখার দরকার নাই। আরেক প্রিয় আঁকিয়ে Scottie Young এর আঁকাও দারুণ।


১২. Stories of Your Life and Others - Ted Chiang

এই বইমেলায় বের হওয়া অনুবাদটা পড়েছি। লেখক একদমই প্রথাবিরোধী সাই ফাই লেখক, তার গল্পের পেছনের বিজ্ঞানের ভাবনা আর গল্পের এক্সিকিউশান দুইটাই খুবই আলাদা। কিছু গল্প ভালো লেগেছে, কিছু গল্প লাগে নাই।

১৩. How to Talk To Girls at Parties - Neil Gaiman ( Artists - Fabio Moon and Gabriel Ba)

গাইম্যানের খুবই খুবই অড একটা ছোটগল্পের কমিক ভার্সন। এঁকেছে বারজিলিয়ান মানিকজোড় ফেবিও মুন আর গ্যাব্রিয়েল বা যমজ ভাতৃদ্বয়। ওয়াটারকালারের এউ স্টাইলটা এই গল্পের মুডের সাথে তো মানিয়ে যাবে ভাবতেই পারিনাই, শেষের দিকের জলরং এর কাজগুলা একেবারে খাসা। গুডরিডসের আমার একটা ছোটখাট রিভিউ আছে এখানে

HOW TO TALK TO GIRLS AT PARTIES
লেখা-আঁকার চমৎকার জুটি। 
১৪. Snow, Glass, Apples - Neil Gaiman ( Artist - Colleen Doran )

স্মোক অ্যান্ড মিরর্স বইয়ের সর্বশেষ এবং আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্পের কমিক ভার্সন। পুরো বইটাই কমিকের জন্য খুবই আন ইউজুয়াল স্টাইলে আঁকা, পরে ঘেটে দেখলাম দেড়শো বছর পুরনো এক মাস্টার আর্টিস্টস Henry Clarke এর গথিক ইলাস্ট্রেশনস থেকে ইন্সপায়ার্ড স্টাইল। তবে কালারিং খুবই দুর্বল ।
বইয়ের কভার 

হেনরি ক্লার্কের ক্লাসিক গথিক আর্টওয়ার্ক,
 এডগার এলান পোর গল্পের জন্য

১৫. অন্ধ জাদুকর - শরিফুল হাসান

ইন্টারেস্টিং প্লট, ফ্যান্টাসি। ট্রিলোজির প্রথম বই। মোটামুটি এক্সিকিউশন, অনেক বেশি কিছুই সিক্যুয়েলের জন্য রেখে দেওয়া। স্বকীয় বই হিসেবে এলিমেন্ট আরও বেশি থাকলে ভাল্লাগতো।

১৬. গল্পসমগ্র - আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

এটা শেষ হয়নাই, ইচ্ছে করেই জমিয়ে জমিয়ে পড়ছি। একেকটা গল্প পড়ি আর মুগ্ধতায় হাহাকার করে উঠি।

আপাতত এই। আমি একবারে ৫/৬টা বই একসাথে পাশাপাশি পড়ি, এখনও সেভাবেই পড়া হচ্ছে। দেখা যাক কোনটা আগে শেষ হয়।